ডিসিসিআইয়ের সেমিনারে বক্তারা

মূল্যস্ফীতি কমাতে বাজার তদারকি বাড়াতে হবে

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরো বাড়াতে হবে। আর সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাড়াতে হবে কর-জিডিপি অনুপাত। কর আদায় ব্যবস্থা আরো আধুনিক করা প্রয়োজন।

এছাড়া মূল্যস্ফীতি কমাতে রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজার তদারকি বাড়াতে হবে।

গতকাল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন বক্তারা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।

তাসকীন আহমেদ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, এলডিসি উত্তরণ, মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শিল্প, সিএমএসএমই ও জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিষয়ে আলোকপাত করে বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাত বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য হুমকি তৈরি করেছে। শিল্প খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় দেশের বেসরকারি খাতে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে এবং মার্কিন শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন, সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রজেক্টের (এসএসজিপি) প্রকল্প পরিচালক এএইচএম জাহাঙ্গীর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন।

তাসকীন আহমেদ এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেয়া, বাণিজ্য সহজীকরণ, রফতানি বহুমুখীকরণ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার কমানো, বিনিয়োগ বাড়াতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার নির্বাচনী ইশতাহারে বর্ণিত আর্থিক সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর নীতি প্রণয়নে কাজ করে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় সরকার সচেতন এবং এ অভিঘাত মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশের উন্নয়নের সুফল যেন প্রতিটি মানুষ পেতে পারে সেটার ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকার প্রাধান্য দেবে।’

বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, ‘আয় ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সহায়তা প্রদানের কাজ করছে নতুন সরকার, যা প্রশংসার দাবি রাখে। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণের সরকারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে হলে সবার আগে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। এক্ষেত্রে উৎপাদনশীল খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং বিশেষ করে এসএমইদের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হলে নতুন পদ্ধতি ও পন্থা নিশ্চিত করতে হবে, শুধু ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে সুফল পাওয়া যাবে না, এছাড়া এসএমইদের টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে বৃহৎ শিল্পের চাকাকেও গতিশীল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সার্বিকভাবে একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিস্থিতির জন্য উচ্চ সুদহার কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন বলেন, ‘মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে ৯-এ রয়েছে, তবে সম্প্রতি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি নিতে হবে, তা না হলে মুদ্রাস্ফীতি আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহ ও সুদের হার হঠাৎ করে হ্রাস করলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

এছাড়া আলোচনায় পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, যুক্তরাজ্যভিত্তিক রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম রিয়াজ আসাদুল্লাহ এবং বিজিএমইএর পরিচালক ও সুরমা গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল সামাদ অংশ নেন।

মুক্ত আলোচনায় প্রাক্তন পরিচালক এ কে ডি খায়ের মোহাম্মদ খান, স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক সালাহউদ্দিন ইউসুফ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাসহ সরকারি ও বেসরকারি খাতের আমন্ত্রিত অতিথিরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

আরও